বিষাক্ত নীল পদ্ম উপন্যাস পর্বঃ ২ কাঁচের দেয়াল

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

 

বিষাক্ত নীল পদ্ম উপন্যাস

সকাল আটটা। ডাইনিং টেবিলের ওপর সাজানো ধোঁয়া ওঠা পরাটা, ডিম ভাজি আর আদা চা। জানালার পর্দাগুলো সরানো, ফলে সকালের একফালি কড়া রোদ এসে পড়েছে কাঁচের টেবিলটার ওপর। বাইরে থেকে দেখলে একে একটি আদর্শ সুখী পরিবারের সকাল বলে মনে হবে। কিন্তু এই টেবিলের দুই প্রান্তে বসে থাকা দুজন মানুষের মাঝখানে এখন কয়েক আলোকবর্ষের দূরত্ব।

সাফওয়ান তার চায়ের কাপে চামচ নাড়ছে। চামচের টুংটাং শব্দটা এই নিস্তব্ধ ঘরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি করছে। সে মরিয়মের দিকে তাকাতে পারছে না। মরিয়ম ধীরস্থিরভাবে তার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে, কিন্তু তার নড়াচড়ায় কোনো প্রাণ নেই। সে যেন এক যান্ত্রিক মানবী।

মৌনতার আর্তনাদ
সাফওয়ান অনুভব করছে, তাদের মাঝখানে একটা কাঁচের দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে। দেয়ালটা স্বচ্ছ, তাই একে অপরকে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু স্পর্শ করা যাচ্ছে না। কথা বলা যাচ্ছে, কিন্তু হৃদয়ের কম্পন পৌঁছাচ্ছে না। সাফওয়ানের মনে পড়ল, কয়েক বছর আগেও এই সকালগুলো কেমন ছিল। তারা হাসাহাসি করত, নতুন নাশিদের সুর নিয়ে আলোচনা করত। মরিয়ম ছিল তার প্রথম শ্রোতা, তার সবচেয়ে বড় সমালোচক।

কিন্তু আজ? আজ সাফওয়ানের মনে হচ্ছে সে এক অপরাধীর কাঠগড়ায় বসে আছে। মরিয়ম কি কিছু জানে? নাকি সে কেবল অনুভব করছে? নারীরা যখন নীরব হয়ে যায়, তখন সেই নীরবতা যে কোনো চিৎকারের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়। সাফওয়ান বুঝতে পারছে, মরিয়ম তার চোখের দিকে তাকাচ্ছে না। সম্ভবত সে তার স্বামীর চোখের ভেতর সেই পুরোনো পবিত্রতা আর খুঁজে পাচ্ছে না।

স্মৃতি ও বর্তমানের সংঘাত
সাফওয়ান এক টুকরো পরাটা মুখে দিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। তাদের বারান্দার টবে লাগানো সেই নীল অপরাজিতা গাছটা বেশ বড় হয়েছে। সাফওয়ান আর মরিয়ম মিলে ওটা লাগিয়েছিল। তখন তাদের জীবনে কোনো 'তৃতীয় ব্যক্তি'র ছায়া ছিল না। আজ সেই গাছটির দিকে তাকালে সাফওয়ানের মনে হচ্ছে, সে নিজে ওই লতাটির মতো কোনো এক বিষাক্ত আশ্রয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে।

"চা কি ঠান্ডা হয়ে গেল?" মরিয়মের কণ্ঠস্বর ভাঙল এই নিস্তব্ধতা।

সাফওয়ান চমকে উঠল। "না, না। ঠিক আছে।"

"তুমি কি আজ কোনো রেকর্ডিংয়ে যাবে?" মরিয়মের প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু সাফওয়ানের কানে তা শোনাল জেরার মতো।

সে উত্তর দিল, "হ্যাঁ, একটা নতুন নাশিদের কাজ আছে। স্টুডিওতে অনেকটা সময় দিতে হবে।"

সাফওয়ান মিথ্যা বলছে। আজ তার কোনো রেকর্ডিং নেই। আজ তার পরিকল্পনা ছিল শহরের উপকণ্ঠে এক নিরিবিলি ক্যাফেতে সাহেলার সাথে দেখা করার। এই মিথ্যেটা বলার সময় সাফওয়ানের গলার স্বর কিছুটা কেঁপে গেল। সে দ্রুত চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে পড়ল।

অদৃশ্য ক্যান্সারের বিস্তার
সাফওয়ান যখন বেডরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল, তার মনে হলো সে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি নয়, বরং একজন অপরিচিত মানুষকে দেখছে। সে পাঞ্জাবির কলার ঠিক করল, দামী আতর মাখল। এই সাজগোজ কি তার ভক্তদের জন্য? নাকি সেই নিষিদ্ধ মরীচিকার জন্য?

তার মনে পড়ে গেল খালিদ হোসাইনির একটি দর্শনের কথা—"মানুষ যখন তার ভালোবাসার মানুষকে অবহেলা করে, তখন সে আসলে নিজের আত্মার একটি অংশকে হত্যা করে।" সাফওয়ান প্রতিদিন মরিয়মের বিশ্বাস ভাঙছে, আর তার বিনিময়ে সে যা পাচ্ছে, তা কেবল কিছু সাময়িক উত্তেজনা আর ক্ষণস্থায়ী প্রশংসা।

সে দেখল মরিয়ম ঘরের কোণে রাখা বুকশেলফটা গোছাচ্ছে। মরিয়মের আঙুলগুলো আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে সাফওয়ানের লেখা সুরের ডায়েরিগুলো। সাফওয়ানের ইচ্ছে হলো ছুটে গিয়ে মরিয়মকে জড়িয়ে ধরে সব বলে দিতে। বলতে—"মরিয়ম, আমি হারিয়ে যাচ্ছি। আমাকে বাঁচাও। আমাকে আগের মতো সেই জায়নামাজের পাশে নিয়ে যাও।" কিন্তু তার নফস বা অহংকার তাকে বাধা দিল। শয়তান তার কানে কানে ফিসফিস করে বলল, "এখন বললে সব শেষ হয়ে যাবে। তোমার সম্মান, তোমার ক্যারিয়ার—সব মাটিতে মিশে যাবে। একটু আড়াল রাখলে ক্ষতি কী?"

গৃহের গুমোট পরিবেশ
সাফওয়ান যখন ড্রয়িংরুম পেরিয়ে দরজার দিকে যাচ্ছিল, তখন তার নজর পড়ল দেয়ালে টাঙানো একটি ক্যালিগ্রাফির ওপর। তাতে লেখা—'ফাসবির সাবরান জামিলা' (অতএব তুমি সুন্দর ধৈর্য ধারণ করো)।

মরিয়ম কি এই ধৈর্যই ধরছে? সাফওয়ান জানে, পরকিয়া কেবল একটি ঘর ভাঙে না, এটি একটি মানুষের বিশ্বাস করার ক্ষমতাকেও চিরতরে নষ্ট করে দেয়। সে দরজার লক খোলার সময় একবার পেছন ফিরে তাকাল। মরিয়ম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ছায়াটা মেঝের ওপর দীর্ঘ হয়ে পড়েছে। বাইরের রোদেলা সকালের সাথে এই ঘরের ভেতরের মেঘলা আবহাওয়া একদমই মিলছে না।

সাফওয়ান বেরিয়ে এল। লিফটের আয়নায় সে নিজেকে দেখল। সুন্দর পাঞ্জাবি, চোখে সুরমা, মুখে মৃদু হাসি—একজন আদর্শ নাশিদ শিল্পী। কিন্তু তার পকেটে থাকা ফোনটি যখন আবার টুং করে বেজে উঠল, সাফওয়ানের মনে হলো এটি কোনো মেসেজ নয়, এটি আসলে তার পতনের ঘণ্টা।

শহরের যান্ত্রিক কোলাহলে সে মিশে গেল। গাড়ির এসি চালিয়ে সে যখন সাহেলার নাম্বারে ডায়াল করল, তখন তার মনে হলো সে আসলে তার ঘরের সেই শান্তিকে পেছনের ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে যাচ্ছে।

দর্শনের ছোঁয়া
এই যে পরকিয়া—এটি আসলে একটি ভাইরাস। এটি খুব ধীরলয়ে আক্রমণ করে। প্রথমে এটি ইবাদতের স্বাদ কেড়ে নেয়, তারপর এটি মানুষের পারিবারিক বন্ধনকে বিষাক্ত করে এবং সবশেষে এটি মানুষকে একাকীত্বের এমন এক অন্ধকারে ফেলে দেয় যেখান থেকে ফেরার পথ খুব সংকীর্ণ। সাফওয়ান এখন সেই সরু অন্ধকার সুড়ঙ্গে প্রবেশ করছে। সে জানে না, এই সুড়ঙ্গের শেষে আলো আছে নাকি কেবলই অনন্ত ধ্বংস।

["কল্পনার তুলিতে আঁকা এই কাহিনীর প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনা একান্তই কাল্পনিক। ইতিহাসের কোনো পাতা বা বাস্তবের কোনো মানুষের ছায়ার সাথে এর কোনো যোগসূত্র নেই। কোনো মিল পাওয়া গেলে তা লেখকের অনিচ্ছাকৃত এবং নিছক কাকতালীয় ঘটনা মাত্র।"]
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default